রোডস শহর গ্রিসের রোডস দ্বীপের রাজধানী, ডোডেকানিজের বৃহত্তম এই দ্বীপের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। এর প্রাচীরঘেরা মধ্যযুগীয় নগরী, যা মূলত চতুর্দশ শতকের শুরু থেকে ষোড়শ শতকের শুরুর মধ্যে নাইটস হসপিটালাররা গড়ে তোলেন, 1988 সাল থেকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, আর একে প্রায়ই ইউরোপের সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত মধ্যযুগীয় শহরগুলোর একটি বলা হয়। এর চারপাশে ইতালীয় আমলের ভবন, বন্দর ও সমুদ্রতীর নিয়ে একটি আধুনিক শহর, যেখানে স্থায়ীভাবে বাস করেন কয়েক দশ হাজার মানুষ।
পর্যটকেরা আসেন নাইটদের সড়ক আর পুরোনো প্রাচীর ধরে হাঁটতে, শহরের কাছেই সাঁতার কাটতে, নৌকায় কাছের দ্বীপগুলোতে যেতে, আর প্রায় 80 কিলোমিটার লম্বা দ্বীপটি ঘুরে দেখার ঘাঁটি হিসেবে রোডস শহরকে ব্যবহার করতে। এক ভ্রমণেই শহর-ছুটি আর সৈকতের অবকাশ চান এমন ইতিহাসপ্রেমী, দম্পতি ও পরিবারের জন্য এটি উপযুক্ত। ছুটির ভাড়াবাসার মধ্যে আছে প্রাচীরের ভেতরের পাথরের বাড়ি থেকে শুরু করে নিউ টাউনের অ্যাপার্টমেন্ট এবং কস্কিনু ও ইয়ালিসোসের মতো গ্রামের ভিলা পর্যন্ত।
ওল্ড টাউনের ভেতরে থাকলে আপনি থাকবেন দর্শনীয় স্থানগুলোর মাঝেই, পাথরের বাড়ি ও উঠানে, যা দিনের পর্যটকেরা চলে গেলে নিরিবিলি হয়ে আসে। গলিগুলো সরু ও পাথর বাঁধানো, আর পার্কিংয়ের জায়গা খুবই সীমিত, তাই হালকা মালপত্র নিয়ে আসুন এবং নিকটতম ফটক থেকে হেঁটে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন। প্রাচীরঘেরা নগরীর দুটি অংশ: উত্তরের উঁচু শহর, যা পুরোটাই নাইটদের তৈরি, আর দক্ষিণের নিচু শহর, যার মধ্যে আছে পুরোনো ইহুদি মহল্লা লা হুদেরিয়া।
প্রাচীরের উত্তরে মান্দ্রাকি বন্দর ঘিরে নিউ টাউন তুলনামূলক সমতল ও ব্যস্ত, এখানে আছে দোকান, ক্যাফে, ইতালীয় আমলের সরকারি ভবন, আর কয়েকটি রাস্তা পরেই সমুদ্র। পরিবার ও দীর্ঘ সময় থাকতে চাওয়া পর্যটকেরা প্রায়ই খোঁজেন পশ্চিম উপকূল ধরে ইক্সিয়া ও ইয়ালিসোসের দিকে, কিংবা দক্ষিণ-পূর্বে কাল্লিথেয়া ও ফালিরাকির দিকে, যেখানে অ্যাপার্টমেন্ট ও ভিলায় বেশি জায়গা মেলে এবং সৈকত কাছেই। পৌরসভার বাস এই সব এলাকাকে কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করে।
নাইটস হসপিটালাররা চতুর্দশ শতকের শুরুতে রোডসকে তাঁদের সদর দপ্তর করেন এবং 1522 সালের উসমানীয় অবরোধ পর্যন্ত তা ধরে রাখেন। তাঁদের সুরক্ষিত করা নগরীটি প্রায় 4 কিলোমিটার লম্বা একটি প্রাচীরে ঘেরা, যা 1480 সালের প্রথম উসমানীয় অবরোধ ও তার পরের বছরের ভূমিকম্পের পর পুনর্নির্মিত হয়। নাইটদের সড়ক উঁচু শহরের ভেতর দিয়ে উঠে গেছে গ্র্যান্ড মাস্টারের প্রাসাদ পর্যন্ত, যা 1856 সালে বারুদের এক বিস্ফোরণে অনেকাংশে ধ্বংস হয়ে যায় এবং ইতালীয় শাসনামলে পুনর্নির্মিত হয়।
নিচু শহরে গথিক বাড়ির সঙ্গে মিশে আছে প্রায় চার শতাব্দীর উসমানীয় শাসনের উত্তরাধিকার: সুলতান সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের মসজিদ, হাফিজ আহমেদ আগা গ্রন্থাগার, গণস্নানাগার আর গলির ওপর ঝুলে থাকা কাঠের ঘেরা বারান্দা। লা হুদেরিয়ার কাহাল শালোম সিনাগগ দ্বীপের ইহুদি সম্প্রদায়ের স্মৃতি বহন করে। প্রাচীরের ঠিক বাইরে রোডসের অ্যাক্রোপলিসে আছে পিথীয় অ্যাপোলোর একটি মন্দির, একটি প্রাচীন থিয়েটার ও একটি স্টেডিয়ামের ধ্বংসাবশেষ।
নগরীটি প্রতিষ্ঠিত হয় খ্রিস্টপূর্ব 408 সালে, যখন দ্বীপের তিনটি পুরোনো নগরী — ইয়ালিসোস, কামিরোস ও লিন্ডোস — একজোট হয়ে উত্তর প্রান্তে একটি নতুন রাজধানী গড়ে তোলে। সমুদ্রবাণিজ্য ও জাহাজ নির্মাণ তিন শতাব্দী ধরে একে সমৃদ্ধ করে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের শুরুতে লিন্ডোসের ভাস্কর খারেস নির্মাণ করেন রোডসের কলোসাস — সূর্যদেবতা হেলিওসের এক বিশাল মূর্তি এবং প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি, যা বন্দরের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল বলে মনে করা হয়; খ্রিস্টপূর্ব প্রায় 226 সালে এক ভূমিকম্পে এটি ভেঙে পড়ে।
এরপর আসে রোমান ও বাইজেন্টাইন শাসন, তারপর নাইটরা, আর 1523 সাল থেকে উসমানীয়রা। 1912 সালে ইতালি ডোডেকানিজ দখল করে, নাইটদের ভবনগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কার করে এবং মান্দ্রাকি ধরে নিউ টাউনের নকশা করে। 1944 সালের জুলাইয়ে জার্মান কর্তৃপক্ষ রোডসের প্রায় 1,700 ইহুদিকে আউশভিৎসে নির্বাসিত করে; বেঁচে ফেরেন মাত্র প্রায় 150 জন। 1947 সালে রোডস ও ডোডেকানিজের অন্যান্য দ্বীপ গ্রিসের সঙ্গে একীভূত হয়।
রোডস শহর দ্বীপের উত্তর অন্তরীপে, তিন দিকে সমুদ্র, তাই সাঁতারের জায়গা কখনোই দূরে নয়। ইয়ালিসোস ও বিমানবন্দরের দিকের পশ্চিম উপকূলে বাতাস বেশি লাগে, যা উইন্ডসার্ফার ও কাইটসার্ফারদের টানে, যেমন টানে দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের প্রাসোনিসি। পূর্ব উপকূল বাতাস থেকে তুলনামূলক আড়ালে: শহর থেকে প্রায় 14 কিলোমিটার দক্ষিণের ফালিরাকিতে আছে মোটামুটি 5 কিলোমিটার লম্বা বালুকাময় সৈকত, আর আরও উপসাগর পেরিয়ে পথ চলে গেছে লিন্ডোসের দিকে।
প্রায় 40 কিলোমিটার দক্ষিণের লিন্ডোস সাদা বাড়ির একটি গ্রাম, যার ওপরে এক অ্যাক্রোপলিস, যেখানে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় 300 সালের আথেনা লিন্ডিয়ার একটি ডোরীয় মন্দির দাঁড়িয়ে আছে নাইটদের তৈরি এক দুর্গের ভেতরে। ভেতরের দিকে প্রজাপতি উপত্যকা বা পেতালুদেস গ্রীষ্মে টাইগার মথে ভরে যায়, আর 1,216 মিটার উঁচু আতাভিরোস পর্বত দ্বীপের সর্বোচ্চ বিন্দু। পশ্চিম উপকূলে প্রাচীন কামিরোসের ধ্বংসাবশেষে কাটানো যায় তুলনামূলক নিরিবিলি আধা দিন।
রোডস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়াগোরাস (RHO) শহর থেকে প্রায় 14 কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। এখানে সারা বছর এথেন্স ও গ্রিসের অন্যান্য বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট আসে, আর গ্রীষ্মে চলে বহু মৌসুমি আন্তর্জাতিক রুট। রোডস শহরের তিনটি বন্দর: ফেরি একে পিরেউস, ডোডেকানিজের অন্যান্য দ্বীপ ও সাইক্লেডিসের সঙ্গে যুক্ত করে, গ্রীষ্মজুড়ে ক্রুজ জাহাজ ভেড়ে, আর নৌযান তুরস্কের উপকূলের মারমারিস ও ফেতিয়েতে যায়, তাই সেসব ভ্রমণে ভ্রমণের কাগজপত্র সঙ্গে নিন।
ওল্ড টাউন ও নিউ টাউন হেঁটে ঘোরাই সবচেয়ে ভালো। RODA পরিচালিত পৌরসভার বাস শহরতলি, বিমানবন্দর ও পশ্চিম উপকূলে যায়, আর KTEL বাস পূর্ব উপকূল ধরে ফালিরাকি ও লিন্ডোসের মতো অবকাশকেন্দ্র ও গ্রামে যায়। কেন্দ্রের স্ট্যান্ডে ট্যাক্সি অপেক্ষা করে। গ্রীষ্মে যানজট ও পার্কিং কঠিন, তাই ভাড়া গাড়ি শহরে চলাফেরার চেয়ে দক্ষিণাঞ্চল ও দ্বীপের ভেতরের দিকে ঘোরার দিনগুলোতেই বেশি কাজে আসে।
রোডসের জলবায়ু উষ্ণ-গ্রীষ্মের ভূমধ্যসাগরীয়, আর এর পুরোনো ডাকনাম 'সূর্যের দ্বীপ' এসেছে প্রাচীন নগরীর সূর্যদেবতা হেলিওস থেকে। গ্রীষ্ম দীর্ঘ, গরম ও শুষ্ক, আর এজিয়ানের এই অংশের জোরালো মৌসুমি বাতাস উপকূলকে শীতল রাখে এবং দ্বীপটিকে পালতোলা নৌকা চালানোর একটি কেন্দ্রে পরিণত করেছে। শীত মৃদু ও তুলনামূলক বৃষ্টিবহুল। লিন্ডোসের আশপাশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল উত্তরের চেয়ে উষ্ণ।
জুলাই ও আগস্ট সবচেয়ে ব্যস্ত মাস, যখন দুপুরে ক্রুজের যাত্রী ও দিনের পর্যটকে ওল্ড টাউনের গলি ভরে যায়। মে, জুন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর সৈকতের জন্য যথেষ্ট উষ্ণ, আর প্রাচীর ধরে হাঁটা বা লিন্ডোসের অ্যাক্রোপলিসে ওঠার জন্য বেশি আরামদায়ক। রোডস শহর নিজস্ব বাসিন্দা, অফিস ও বাজারসহ সারা বছরের শহর বলে শীতেও সচল থাকে, আর তখনই ওল্ড টাউন সবচেয়ে শান্ত।
মধ্যযুগীয় দর্শনীয় স্থানগুলোর মাঝে রাত কাটাতে চান এবং পাথুরে রাস্তা ও সিঁড়িতে আপত্তি নেই এমন পর্যটকদের জন্য ওল্ড টাউন উপযুক্ত। মান্দ্রাকি ঘিরে নিউ টাউন তুলনামূলক সমতল এবং বাসে ভালোভাবে যুক্ত। সৈকত ও বেশি জায়গা চান এমন পরিবার প্রায়ই বেছে নেয় ইক্সিয়া, ইয়ালিসোস, কাল্লিথেয়া বা ফালিরাকি।
মে, জুন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে আবহাওয়া উষ্ণ, সমুদ্রে সাঁতার কাটা যায়, আর জুলাই-আগস্টের চেয়ে ভিড় কম, যখন দ্বীপটি সবচেয়ে ব্যস্ত ও গরম। শীত মৃদু ও নিরিবিলি, গ্রীষ্মের গরম ছাড়া ওল্ড টাউন ঘুরে দেখার ভালো সময়।
রোডস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়াগোরাস (RHO) রোডস শহর থেকে প্রায় 14 কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। ট্যাক্সি ও পৌরসভার বাস একে কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করে, আর গ্রীষ্মের যানজটের সময় বাদে গাড়িতে সাধারণত অল্প সময় লাগে। ইয়ালিসোসের মতো পশ্চিম উপকূলের অবকাশকেন্দ্রগুলো বিমানবন্দর ও শহরের মাঝখানে।
ওল্ড টাউন, গ্র্যান্ড মাস্টারের প্রাসাদ, প্রাচীর এবং রোডসের অ্যাক্রোপলিসের জন্য দুই-তিন দিন যথেষ্ট। এক সপ্তাহ থাকলে যোগ করতে পারেন লিন্ডোস, প্রজাপতি উপত্যকা, প্রাচীন কামিরোস, পূর্ব উপকূলে সৈকতের কয়েকটি দিন এবং নৌকায় সিমি ভ্রমণ।
হ্যাঁ। সিমি রোডস থেকে প্রায় 24 কিলোমিটার উত্তরে, আর শহরের বন্দরগুলো থেকে এটি জনপ্রিয় একটি নৌভ্রমণ। তুরস্কের উপকূলের মারমারিস ও ফেতিয়েতেও ফেরি যায়। তুরস্কের জন্য বৈধ ভ্রমণ-কাগজপত্র লাগে, আর যাওয়ার আগে প্রবেশের বর্তমান নিয়ম দেখে নেওয়া উচিত।
হ্যাঁ। গ্রিসে স্বল্প সময়ের জন্য ভাড়া দেওয়া বাড়িকে কর কর্তৃপক্ষ AADE-র (স্বাধীন জনরাজস্ব কর্তৃপক্ষ) স্বল্পমেয়াদি আবাসন নিবন্ধন-তালিকায় (Short-Term Stay Property Registry) অন্তর্ভুক্ত করতে হয়, যা প্রতিটি বাড়িকে AMA নামের একটি নিবন্ধন নম্বর দেয়। হোস্টদের এটি লিস্টিংয়ে দৃশ্যমানভাবে দেখাতে হয়, আর লাইসেন্সপ্রাপ্ত পর্যটন আবাসন নিজের লাইসেন্স নম্বর প্রদর্শন করে।
হ্যাঁ। শিশুরা প্রাচীর, বিশাল ফটক আর গ্র্যান্ড মাস্টারের প্রাসাদ উপভোগ করে, আর সব দিকেই সমুদ্র কাছে। ওল্ড টাউনের পাথুরে রাস্তায় স্ট্রলার ঠেলা কষ্টকর, তাই পরিবারগুলো প্রায়ই নিউ টাউন বা সৈকতঘেঁষা কোনো শহরতলিতে থাকে এবং দিনের বেলায় প্রাচীরঘেরা নগরী ঘুরে আসে।
এআই-এর সহায়তায় গবেষণা ও লেখা হয়েছে, তারপর নিচের উৎসগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে তথ্য যাচাই করা হয়েছে। সর্বশেষ যাচাই: ।